রুচি, ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধে অনন্য এক শিক্ষক জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার
একজন নিবেদিত শিক্ষকের গল্প
রুচি, ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্ববোধে অনন্য এক শিক্ষক
জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার
কিছু মানুষকে মনে পড়ে তাঁদের কথার জন্য, কিছু মানুষকে কাজের জন্য। আবার এমন বিরল মানুষও আছেন, যাঁদের কথা, কাজ, চলন, রুচিবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা—সব মিলিয়ে একটি সময়ের উজ্জ্বল স্মারক হয়ে ওঠে। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের জনপ্রিয় সহকারী প্রধান শিক্ষক ও ইংরেজি শিক্ষক জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা শুধু একজন শিক্ষককে দেখত না; তারা দেখত পরিপাটি, আধুনিক, আত্মবিশ্বাসী ও অনুকরণীয় এক ব্যক্তিত্বকে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পোশাক, সুন্দরভাবে শার্ট ইন করা, পায়ে চকচকে জুতা, শরীরে মৃদু সুগন্ধি এবং গুছিয়ে কথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা—সব মিলিয়ে তৎকালীন কালীগঞ্জের শিক্ষকসমাজে তিনি ছিলেন স্বতন্ত্র এক নাম। শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে ইংরেজি শিখত। পাশাপাশি শিখত পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা, মার্জিত আচরণ ও আত্মমর্যাদার পাঠ। তাই মাহবুব স্যার কেবল ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের রুচি, আধুনিকতা ও দায়িত্ববোধের পথপ্রদর্শক।
১৯৪১ সালের ২৩ অক্টোবর লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারী ইউনিয়নের শ্রুতিধর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন জনাব মোঃ মহবুবর রহমান। তাঁর পিতা মোঃ শাহ আলম এবং মাতা মোছাঃ সৈয়দা খাতুন। গ্রামের সহজ-সরল পরিবেশে বেড়ে উঠলেও তাঁর দৃষ্টি ছিল শিক্ষার বিস্তৃত জগতের দিকে। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত উন্নতির মাধ্যম নয়; এটি মানুষকে আত্মমর্যাদাশীল করে, সমাজকে আলোকিত করে এবং জাতিকে এগিয়ে নেয়।
তৎকালীন গ্রামাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অনুন্নত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল অপ্রতুল এবং সাধারণ পরিবারের সন্তানদের পড়াশোনার পথে ছিল নানা বাধা। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি শিক্ষার পথ থেকে সরে যাননি। ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৬০ সালে আইএ এবং ১৯৬৬ সালে বিএ পাস করেন তিনি। সেই সময়ের গ্রামীণ বাস্তবতায় তাঁর এই অর্জন ছিল অধ্যবসায়, প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও শিক্ষার প্রতি অটুট নিষ্ঠার এক গৌরবময় দৃষ্টান্ত। নিজে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হয়ে সেই আলো অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে তিনি বেছে নেন শিক্ষকতার মহান পেশা।
১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার সহকারী শিক্ষক হিসেবে কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তখন তাঁর নির্ধারিত মাসিক বেতন ছিল মাত্র ২৩০ টাকা। কিন্তু একজন শিক্ষকের মূল্য কি কখনো তাঁর বেতনের অঙ্ক দিয়ে নির্ধারণ করা যায়? মাহবুব স্যারের প্রকৃত অর্জন ছিল শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, সহকর্মীদের শ্রদ্ধা এবং সাধারণ মানুষের আস্থা। তাঁর শ্রেণিকক্ষ শুধু পাঠদানের স্থান ছিল না; সেটি ছিল ভাষা, আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের এক জীবন্ত কর্মশালা।
তিনি এমন এক সময়ে ইংরেজি শেখাতেন, যখন গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর কাছে বিষয়টি ছিল ভীতি ও সংকোচের নাম। অনেকের ধারণা ছিল, ইংরেজি যেন শুধু শহরের মানুষ কিংবা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ভাষা। মাহবুব স্যার সেই ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর সুন্দর উচ্চারণ, সাবলীল উপস্থাপন ও আন্তরিক পাঠদান শিক্ষার্থীদের মনে ইংরেজি শেখার আগ্রহ সৃষ্টি করত। কোনো শিক্ষার্থী ভুল করলে তিনি সংশোধন করতেন, কিন্তু অপমান করে তার শেখার আগ্রহ নষ্ট করতেন না। তিনি চাইতেন শিক্ষার্থীরা চেষ্টা করুক, ভুল থেকে শিখুক এবং ধীরে ধীরে নিজের জড়তা কাটিয়ে উঠুক।
তাঁর উপস্থিতিই যেন বলে দিত—গ্রামে জন্মগ্রহণ করেও শিক্ষিত, আধুনিক, পরিশীলিত ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হওয়া সম্ভব। তাঁকে দেখে অনেক শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখত—
“একদিন আমিও মাহবুব স্যারের মতো স্মার্ট ও সুন্দর ব্যক্তিত্বের মানুষ হব।” একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে—যখন শিক্ষার্থীরা শুধু তাঁর পাঠ নয়, তাঁর জীবনধারাকেও অনুসরণ করতে চায়?
তৎকালীন কালীগঞ্জে মাহবুব স্যার সবচেয়ে স্মার্ট ইংরেজি শিক্ষকদের একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে তাঁর স্মার্টনেস কেবল পোশাক কিংবা চলাফেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর গভীরে ছিল জ্ঞান, পরিমিতিবোধ, সৌজন্য ও আত্মসম্মান। তিনি ধীরে, স্পষ্টভাবে এবং অত্যন্ত গুছিয়ে কথা বলতেন। তাঁর বক্তব্যে অপ্রয়োজনীয় শব্দের বাহুল্য ছিল না; থাকত যুক্তি, সৌজন্য ও আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয়।
নিজের জীবনাচরণ দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন—পরিচ্ছন্ন পোশাক অহংকার নয়; এটি আত্মসম্মান ও শৃঙ্খলার প্রকাশ। মার্জিত ভাষা দুর্বলতা নয়; এটি শিক্ষিত মানসিকতার পরিচয়। আর আধুনিকতা মানে নিজের শিকড় ও মূল্যবোধ ভুলে যাওয়া নয়; বরং জ্ঞান, রুচি ও মানবিকতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করা। তাঁর কাছ থেকে ইংরেজির পাশাপাশি অর্জিত আত্মবিশ্বাস অসংখ্য শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে। একজন শিক্ষক কতটি বাক্য শিখিয়েছেন, তার হিসাব পাঠ্যসূচিতে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তিনি কতজনের ভয় দূর করেছেন, কতজনের মনে স্বপ্ন জাগিয়েছেন কিংবা কতজনকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছেন—তার হিসাব লেখা থাকে শিক্ষার্থীদের জীবনে।
মাহবুব স্যারের কর্মপরিধি বিদ্যালয়ের সীমানায় থেমে থাকেনি। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল ব্যাপক। সাধারণ মানুষ, অভিভাবক, শিক্ষিত সমাজ, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন পেশাজীবীর কাছে তিনি ছিলেন বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানিত ব্যক্তি। কোনো সামাজিক সমস্যা দেখা দিলে তিনি পাশ কাটিয়ে যেতেন না কিংবা অন্য কারও উদ্যোগের অপেক্ষায় বসে থাকতেন না। সবার আগে এগিয়ে এসে মানুষের কথা শুনতেন, সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করতেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ তৈরি করতেন। শুধু উপস্থিত হয়ে দায়িত্ব শেষ করতেন না; একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি ফিরতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব নিজের পরিবার ও পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। অন্যায়, বিরোধ, সংকট কিংবা মানুষের দুর্ভোগের সময় তাঁকে সামনে দাঁড়াতে হবে।
তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার পেছনে ছিল সততা, নিরপেক্ষতা ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার আন্তরিকতা। সামাজিক মর্যাদা কিংবা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে তিনি কাউকে বিচার করতেন না। সত্য, ন্যায় এবং স্থায়ী সমাধানই ছিল তাঁর বিবেচনার মূল ভিত্তি। তাঁর কথার ওজন ছিল, কারণ মানুষ জানত—মাহবুব স্যার ব্যক্তিগত স্বার্থে কথা বলেন না। তিনি যে মত দিতেন, তা বিবেক ও ন্যায়বোধ থেকেই দিতেন। সমাজে গ্রহণযোগ্যতা দাবি করে পাওয়া যায় না; দীর্ঘদিনের সৎ আচরণ, দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং মানুষের পাশে থাকার মধ্য দিয়ে তা অর্জন করতে হয়। মাহবুব স্যার তাঁর কর্মের মাধ্যমেই সেই সম্মান অর্জন করেছিলেন।
১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০০১ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত—দীর্ঘ বত্রিশ বছরেরও বেশি সময় তিনি কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। এই সময়ে তাঁর সামনে দিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে জীবনের বৃহত্তর পথে পা বাড়িয়েছে। কেউ সরকারি কর্মকর্তা হয়েছেন, কেউ শিক্ষক, চিকিৎসক, ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী কিংবা অন্য কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের ব্যক্তিত্ব, শৃঙ্খলা ও আত্মবিশ্বাসের কোথাও না কোথাও আজও হয়তো মাহবুব স্যারের প্রভাব রয়ে গেছে।
২০০১ সালের ২২ অক্টোবর—নিজের ষাটতম জন্মদিনের ঠিক এক দিন আগে—তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সেদিন তাঁর চাকরিজীবনের আনুষ্ঠানিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটেছিল। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতায় তাঁর নিয়মিত স্বাক্ষর বন্ধ হয়েছিল; কিন্তু প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতি থেকে তাঁর উপস্থিতি মুছে যায়নি। শ্রেণিকক্ষে তাঁর কণ্ঠ আর শোনা যেত না, তবু তাঁর শেখানো ভাষা, শৃঙ্খলা ও জীবনবোধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে গেছে।
মাহবুব স্যারের সহধর্মিণী মোছাঃ হামিদা বেগম। তাঁদের তিন সন্তান—সুলতানা মাহবুবা, শাহ সুফি মোঃ শাহজাহান এবং শাহ সুফি মোঃ হুমায়ুন কবির। পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহশীল অভিভাবক, শিক্ষার্থীদের কাছে অনুকরণীয় শিক্ষক, সহকর্মীদের কাছে ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সহযাত্রী এবং সমাজের মানুষের কাছে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি। একজন মানুষের জীবনের সার্থকতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনে নয়; তিনি পরিবার, শিক্ষার্থী ও সমাজের জন্য কী রেখে গেছেন, তার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত মূল্য নিহিত। মাহবুব স্যার রেখে গেছেন একটি সম্মানিত নাম, অনুসরণযোগ্য জীবনধারা এবং জনকল্যাণে কাজ করার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
২০১৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জনাব মোঃ মহবুবর রহমান স্যার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। যে ১ ফেব্রুয়ারি তিনি ১৯৬৯ সালে বিদ্যালয়ে যোগদান করেছিলেন, ঠিক সেই তারিখেই—৪৪ বছর পর—শেষ হয় তাঁর পার্থিব জীবনযাত্রা। এই আশ্চর্য তারিখ-মিল যেন গভীর এক প্রতীক বহন করে। একটি ১ ফেব্রুয়ারিতে তিনি এসেছিলেন শিক্ষার আলো হাতে নিয়ে; আর আরেকটি ১ ফেব্রুয়ারিতে পৃথিবী ছেড়ে গেলেন অসংখ্য শিক্ষার্থীর হৃদয়ে সেই আলো রেখে।
তাঁর মৃত্যুতে পরিবার হারিয়েছিল প্রিয় অভিভাবককে, বিদ্যালয় হারিয়েছিল গৌরবময় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল শিক্ষককে এবং কালীগঞ্জের মানুষ হারিয়েছিল এমন একজন সমাজসচেতন ব্যক্তিকে, যিনি সমস্যা দেখলে কখনো মুখ ফিরিয়ে নিতেন না। তবু একজন আদর্শ শিক্ষকের মৃত্যু কি তাঁর জীবনের শেষ পরিচয়? না।
তাঁর কোনো শিক্ষার্থী যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলেন, মার্জিত আচরণে মানুষের সম্মান অর্জন করেন কিংবা সমাজের কোনো সমস্যা সমাধানে নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসেন—সেই কাজের মধ্যেই মাহবুব স্যারের শিক্ষা নতুন করে জীবন্ত হয়ে ওঠে। মাহবুব স্যারের জীবন কেবল স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; বর্তমান প্রজন্মের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার উৎস।
তিনি দেখিয়েছেন—শিক্ষকের ব্যক্তিত্ব একটি নীরব পাঠ্যপুস্তক। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের মুখের কথা যতটা শেখে, তাঁর জীবনাচরণ থেকেও ততটাই গ্রহণ করে। তিনি শিখিয়েছেন—পরিচ্ছন্নতা, সময়ানুবর্তিতা ও সৌজন্য মানুষের মর্যাদা বাড়ায়। ইংরেজি কিংবা আধুনিক শিক্ষা মানুষকে নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; বরং বৃহত্তর পৃথিবীর সঙ্গে সংযুক্ত করে। তাঁর কর্ম আমাদের আরও মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষিত হওয়ার প্রকৃত অর্থ শুধু সনদ অর্জন নয়। মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং সামাজিক সমস্যার সমাধানে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখাও শিক্ষার অংশ। আজ যখন ব্যক্তিস্বার্থ অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে পেছনে ফেলে দিচ্ছে, তখন মাহবুব স্যারের জীবন নতুন করে ভাবতে শেখায়—সামাজিক নেতৃত্ব কোনো পদ-পদবির নাম নয়; মানুষের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করে সমাধানে এগিয়ে আসাই প্রকৃত নেতৃত্ব।
সময়ের সঙ্গে বিদ্যালয়ের অনেক কিছু বদলে গেছে। পুরোনো ভবনের জায়গায় নতুন ভবন উঠেছে। ব্ল্যাকবোর্ডের পাশে এসেছে ডিজিটাল পর্দা। ইংরেজি শেখার উপকরণ ও পদ্ধতিতেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে মাহবুব স্যার আজও সেই আগের মতোই উপস্থিত— পরিপাটি পোশাকে, পায়ে চকচকে জুতা, গায়ে মৃদু সুগন্ধি, চোখে আত্মবিশ্বাস এবং মুখে গুছিয়ে বলা কথার সৌন্দর্য নিয়ে। তিনি ছিলেন এমন একজন শিক্ষক, যাঁকে দেখে শিক্ষার্থীরা উন্নত ব্যক্তিত্বের মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখত। তিনি ছিলেন এমন একজন সমাজহিতৈষী, যাঁর কাছে মানুষ সমস্যার সমাধান খুঁজত। সময়ের ব্যবধান তাঁর প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা কমাতে পারেনি; বরং সেই অনুভূতিকে আরও গভীর করেছে।
প্রিয় মাহবুব স্যার—
আপনি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু আপনার রুচিশীল উপস্থিতি, মার্জিত আচরণ, ইংরেজি শিক্ষায় দক্ষতা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আপনি ২০০১ সালে বিদ্যালয় থেকে অবসর নিয়েছিলেন— কিন্তু শিক্ষার্থীদের হৃদয় থেকে নয়। আপনি ২০১৩ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন—
কিন্তু আপনার আদর্শ ও কর্মের আলো আজও নিভে যায়নি। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে এবং অগণিত শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে আপনি বেঁচে থাকবেন—একজন দক্ষ ইংরেজি শিক্ষক, রুচিশীল মানুষ এবং দায়িত্ববান সমাজ-অভিভাবক হিসেবে। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আপনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন, প্রিয় মাহবুব স্যার।
Generations Hub - GH Bangladesh