← সব প্রকাশনা
আমাদের প্রিয় শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ জালাল উদ্দিন স্যারগল্প

আমাদের প্রিয় শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ জালাল উদ্দিন স্যার

আমাদের প্রিয় শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ জালাল উদ্দিন স্যার

আমাদের প্রিয় শিক্ষক আলহাজ্ব মোঃ জালাল উদ্দিন স্যার

বিদ্যালয়ের পুরোনো ঘণ্টাটি আজও বাজে। সকাল হলে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ। শ্রেণিকক্ষে খুলে যায় গণিতের বই, বিজ্ঞানের জটিল সূত্র নিয়ে শুরু হয় আলোচনা। কিন্তু সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এই বিদ্যালয়ের দেয়াল, বারান্দা কিংবা কোনো পুরোনো শ্রেণিকক্ষ যদি কথা বলতে পারত, তবে হয়তো তারা গভীর শ্রদ্ধায় একটি নাম উচ্চারণ করত—জালাল স্যার।

হাতে চক, সামনে কালো বোর্ড আর চোখে শিক্ষার্থীদের মানুষ করে তোলার স্বপ্ন—এই ছিল তাঁর সবচেয়ে পরিচিত রূপ। তিনি বোর্ডে শুধু অঙ্কের সমাধান লিখতেন না; শিক্ষার্থীদের জীবন থেকেও ভয়, সংশয় ও অন্ধকারের ভুলগুলো মুছে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। বিজ্ঞানের সূত্র বোঝানোর পাশাপাশি শেখাতেন যুক্তি দিয়ে ভাবতে; আর নিজের জীবন দিয়ে বুঝিয়ে দিতেন—জ্ঞান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সঙ্গে সততা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতা যুক্ত হয়। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকারী প্রধান শিক্ষক আলহাজ মোঃ জালাল উদ্দিন স্যার ছিলেন এমনই একজন মানুষ—যাঁর জীবন ছিল একটি বিদ্যালয়ের ইতিহাস, একটি জনপদের স্মৃতি এবং হাজারো শিক্ষার্থীর হৃদয়ে জ্বলে থাকা এক অবিনাশী প্রদীপ।

১৯৪৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার তুষভান্ডার ইউনিয়নের কাশীরাম গ্রামে জন্ম নিল একটি শিশু। পিতা মরহুম জামান উদ্দিন ও মাতা মরহুমা আনজেমন নেছা হয়তো সেদিন কল্পনাও করেননি, তাঁদের এই সন্তান একদিন এলাকার হাজারো শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক ও অভিভাবক হয়ে উঠবেন। তাঁর নাম রাখা হলো মোঃ জালাল উদ্দিন।

করিমপুর ডাকঘরের অন্তর্গত কাশীরাম গ্রামের সেই সময়ের জীবন ছিল সহজ, কিন্তু সংগ্রামময়। আজকের মতো প্রশস্ত সড়ক, সহজ যোগাযোগ কিংবা হাতের নাগালে প্রয়োজনীয় শিক্ষা-উপকরণ ছিল না। গ্রামে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়া ছিল অনেকটাই স্রোতের বিপরীতে যাত্রার মতো। কিন্তু জালাল উদ্দিনের চোখে ছিল জানার আকাঙ্ক্ষা। বইয়ের পাতায় তিনি শুধু পরীক্ষার উত্তর খুঁজতেন না; খুঁজতেন পৃথিবীকে বোঝার পথ। সীমাবদ্ধতা তাঁকে থামাতে পারেনি। অভাব তাঁর স্বপ্নকে ছোট করতে পারেনি। প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্যের দিকে।

১৯৬৪ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। ১৯৬৬ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৮ সালে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। সে সময় একটি গ্রামীণ জনপদ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা ছিল অত্যন্ত গৌরবজনক অর্জন। তাঁর এই সাফল্যের পেছনে ছিল মেধার সঙ্গে কঠোর পরিশ্রম, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অদম্য অধ্যবসায়। তবে নিজের সাফল্য নিয়েই তিনি থেমে থাকেননি। তিনি বুঝেছিলেন, জ্ঞানের আলো যদি অন্যের জীবন আলোকিত না করে, তবে সেই আলোর পূর্ণতা আসে না। তাই উচ্চশিক্ষা শেষ করে তিনি এমন একটি পথ বেছে নিলেন, যেখানে নিজের অর্জিত জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া যায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তিনি বেছে নিলেন শিক্ষকতা।

১৯৬৮ সালের ২৬ অক্টোবর। কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে সেদিন এক তরুণ বিএসসি শিক্ষক প্রবেশ করেছিলেন। হয়তো তাঁর হাতে ছিল কিছু বই, মনে ছিল নতুন কর্মজীবনের স্বপ্ন এবং হৃদয়ে ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু করার অঙ্গীকার। সেদিন তিনি সহকারী শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। তাঁর ইনডেক্স নম্বর ছিল ২৪০৮৮১। কিন্তু একটি নম্বর দিয়ে কি একজন শিক্ষকের পরিচয় ধারণ করা যায়? কাগজে সেটি ছিল তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়; আর শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে তাঁর পরিচয় হয়ে উঠেছিল—প্রিয় জালাল স্যার। অল্প সময়ের মধ্যেই বোঝা গেল, এই তরুণ শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নিয়ে শ্রেণিকক্ষে আসেননি; তিনি নিয়ে এসেছেন বিষয়কে সহজ করে বোঝানোর অসাধারণ ক্ষমতা। বিশেষত গণিত ও বিজ্ঞানে তাঁর ছিল ঈর্ষণীয় দক্ষতা। অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই গণিত মানে ছিল ভয়—জটিল সূত্র, কঠিন সমীকরণ আর ভুল হওয়ার আতঙ্ক। বিজ্ঞানও কারও কারও কাছে ছিল দুর্বোধ্য সংজ্ঞা ও কঠিন ব্যাখ্যার সমষ্টি। কিন্তু জালাল স্যারের পাঠে সেই ভয় ধীরে ধীরে কেটে যেত। তাঁর ব্যাখ্যায় অঙ্ক হয়ে উঠত যুক্তির খেলা, আর বিজ্ঞান হয়ে উঠত চারপাশের জীবন ও প্রকৃতিকে জানার আনন্দময় জানালা। তিনি জানতেন, শ্রেণিকক্ষের সব শিক্ষার্থী একইভাবে শেখে না। কেউ একবারেই বুঝতে পারে, কাউকে আবার একই বিষয় কয়েকবার বোঝাতে হয়। তাই যেসব শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ত, তিনি তাদের অবহেলা করতেন না। ভুল করলে তিরস্কার দিয়ে থামিয়ে না দিয়ে ভুলের কারণটি ধরিয়ে দিতেন। কঠিন সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে যে শিক্ষার্থী নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলত, তিনি তার মনে আবার সাহস জাগিয়ে তুলতেন।

তিনি যেন নীরবে বলতেন,
“অঙ্ক কঠিন নয়; ভয়টাই কঠিন। আগে ভয়কে জয় করো, সমাধানের পথ নিজেই খুলে যাবে।” এভাবেই তিনি শুধু সমস্যার সমাধান শেখাননি—সমস্যার সামনে স্থির থাকতে শিখিয়েছেন। শুধু সূত্র মুখস্থ করাননি—যুক্তি দিয়ে ভাবতে শিখিয়েছেন। শুধু পরীক্ষায় পাস করার পথ দেখাননি—জীবনের পরীক্ষায় আত্মবিশ্বাসী হওয়ার শক্তি দিয়েছেন। দিন গড়িয়ে বছর চলতে লাগল। একের পর এক শিক্ষার্থী তাঁর কাছে পড়ল, পরীক্ষা দিল, বিদ্যালয় ছেড়ে জীবনের বৃহত্তর অঙ্গনে প্রবেশ করল। কেউ উচ্চশিক্ষায় গেল, কেউ শিক্ষক হলো, কেউ সরকারি-বেসরকারি দায়িত্বে প্রতিষ্ঠিত হলো, আবার কেউ সমাজসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করল। তাদের অনেকের জীবনের ভেতরেই থেকে গেল জালাল স্যারের একটি কথা, একটি শাসন, একটি উৎসাহ কিংবা বোর্ডে বুঝিয়ে দেওয়া কোনো সমাধানের স্মৃতি।

একটি বিদ্যালয়ের পরিচয় শুধু তার ভবন, মাঠ কিংবা ফলাফলে গড়ে ওঠে না। তার প্রকৃত পরিচয় নির্মাণ করেন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকেরা। তাঁরা দিনের পর দিন মেধা, শ্রম, সময় ও ভালোবাসা দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত শক্ত করেন। জালাল উদ্দিন স্যার ছিলেন কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সেই ভিত নির্মাণকারী শিক্ষকদের অন্যতম। তাঁর দক্ষ পাঠদান, নিয়মানুবর্তিতা, দায়িত্ববোধ ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতার ফলে বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ক্রমে উন্নত হতে থাকে। শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফল ও সাফল্যের মধ্য দিয়ে বিদ্যালয়ের সুনাম কালীগঞ্জ থানা ছাড়িয়ে লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর কাছে শিক্ষকতা কোনো চাকরির নাম ছিল না; এটি ছিল এক পবিত্র অঙ্গীকার। তিনি জানতেন, একটি শিশুকে সুশিক্ষিত করা মানে কেবল একজন ভালো পরীক্ষার্থী তৈরি করা নয়—একটি পরিবারে আলো জ্বালানো, একটি সমাজকে শক্তিশালী করা এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা।

তারপর এলো ১৯৭১ সাল। দেশজুড়ে তখন অস্থিরতা, আতঙ্ক ও প্রতিরোধের দিন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের নির্মমতার বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শহর থেকে গ্রাম—সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। জালাল উদ্দিন স্যার তখন একজন তরুণ শিক্ষক। তাঁর হাতে নিয়মিত অস্ত্র ছিল চক-ডাস্টার, তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল শ্রেণিকক্ষ। কিন্তু সময় যখন দেশকে রক্ষার আহ্বান জানাল, তখন তিনি নীরব দর্শক হয়ে থাকেননি। বিদ্যালয়ে বসেই তিনি স্থানীয় যুবসমাজকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করতেন। শত্রুপক্ষকে প্রতিহত করার জন্য তাঁদের প্রয়োজনীয় কৌশল ও পরামর্শ দিতেন। বিজ্ঞানমনস্ক এই শিক্ষক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তরুণদের সচেতন করতেন, সাহস জোগাতেন এবং প্রতিরোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুধু সম্মুখসমরে অস্ত্র হাতে লড়াইয়ের ইতিহাস নয়; এটি তথ্য, আশ্রয়, পরিকল্পনা, সাহস, দিকনির্দেশনা ও জনসমর্থনেরও ইতিহাস। সেই বৃহৎ সংগ্রামে জালাল স্যারের ভূমিকা ছিল হয়তো নীরব, কিন্তু গভীরভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বুঝেছিলেন—পরাধীনতার অন্ধকারে প্রকৃত শিক্ষার আলো জ্বলতে পারে না। স্বাধীনতা ছাড়া মানুষের মর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয় না। তাই তাঁর কাছে শিক্ষকতা ও দেশপ্রেম আলাদা কোনো বিষয় ছিল না; উভয়ই ছিল মানুষ ও মাতৃভূমির প্রতি দায়িত্ব পালনের দুটি রূপ। যে মানুষটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান করতে শেখাতেন, মুক্তিযুদ্ধের সেই দুর্যোগময় দিনগুলোতে তিনিই স্থানীয় তরুণদের সামনে জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজতে সহায়তা করেছিলেন।

সময় থেমে থাকে না। তরুণ শিক্ষক ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন অভিজ্ঞ শিক্ষাগুরু। তাঁর চুলে বয়সের চিহ্ন ফুটে উঠল, কিন্তু দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠা এতটুকুও কমল না। দীর্ঘদিনের দক্ষতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর তিনি বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন দায়িত্বের সঙ্গে তাঁর কাজের পরিধি বাড়ল। কিন্তু পদোন্নতি তাঁকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। তাঁর নেতৃত্বে বাহুল্য ছিল না, ছিল নির্ভরতা। কথায় অহংকার ছিল না, ছিল দৃঢ়তা। তিনি ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে পরিচালনা করতে চাইতেন না; সততা, যুক্তি ও নৈতিক প্রভাব দিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে চাইতেন। নবীন শিক্ষকেরা তাঁর কাছ থেকে পরামর্শ পেতেন। সহকর্মীরা তাঁর অভিজ্ঞতার ওপর আস্থা রাখতেন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তিনি উত্তেজনার পরিবর্তে ধৈর্য, যুক্তি ও ন্যায়বোধ দিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতেন। বিদ্যালয়ের স্বার্থকে তিনি সবসময় ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখেছেন। তাঁর কাছে সহকারী প্রধান শিক্ষকের চেয়ারটি মর্যাদা প্রদর্শনের আসন ছিল না; ছিল আরও বেশি দায়িত্ব গ্রহণের স্থান।

২০০৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্ধারিত বয়সসীমা অনুযায়ী তাঁর অবসর গ্রহণের সময় হলো। দীর্ঘ কর্মজীবনের শেষে সাধারণ নিয়মে তাঁর বিদ্যালয় থেকে বিদায় নেওয়ার কথা। কিন্তু বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন তখনই তাঁকে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিল না। তাঁর অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য অপরিহার্য অবদানের কথা বিবেচনা করে চাকরির মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হলো। একজন শিক্ষকের জীবনে এর চেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি আর কী হতে পারে? এই মেয়াদ বৃদ্ধি যেন নীরবে বলে দিয়েছিল—বিদ্যালয়ের কাছে তিনি শুধু একজন কর্মচারী নন; তিনি প্রতিষ্ঠানটির জ্ঞান, শৃঙ্খলা ও আস্থার প্রতীক। বয়স বাড়লেও তাঁর কর্মস্পৃহা ম্লান হয়নি। বর্ধিত সময়েও তিনি একই নিষ্ঠা ও সুনামের সঙ্গে শিক্ষা উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাঁকে ক্লান্ত করেনি; বরং আরও পরিণত, সহনশীল ও দূরদর্শী করে তুলেছিল। কাগজে একজন শিক্ষক অবসর নিতে পারেন, কিন্তু শিক্ষার্থীদের স্মৃতি থেকে কি কখনো তাঁর অবসর হয়?

জালাল স্যারের প্রভাব শুধু বিদ্যালয়ের প্রাচীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। নিজ এলাকা ও সমাজেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য ও শ্রদ্ধাভাজন একজন মানুষ। সামাজিক সমস্যা, পারিবারিক বিরোধ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্তে মানুষ তাঁর কাছে পরামর্শ নিতে আসত। তাঁরা জানতেন, জালাল স্যারের কথায় ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সত্য, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণ বড় হয়ে উঠবে। তাঁর কথায় দৃঢ়তা ছিল, কিন্তু সেই দৃঢ়তার মধ্যে রূঢ়তা ছিল না। আচরণে ছিল বিনয় ও সংযম। তিনি কাউকে অপমান করে সংশোধন করতে চাইতেন না; যুক্তি, সহমর্মিতা ও সুন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে সঠিক পথটি দেখানোর চেষ্টা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষিত হওয়া মানে শুধু সনদ অর্জন করা নয়। সত্যবাদিতা, দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান এবং সমাজের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা ছাড়া শিক্ষা অসম্পূর্ণ। এই বিশ্বাস তিনি শুধু মুখে বলেননি; জীবন দিয়ে পালন করেছেন।

কর্মজীবনের অবসানপর্বে তিনি পবিত্র হজব্রত পালন করেন। এরপর তাঁর নামের সঙ্গে যুক্ত হয় সম্মানসূচক পরিচয়—আলহাজ মোঃ জালাল উদ্দিন। তিনি ছিলেন গভীর ধর্মবিশ্বাসী ও নীতিবান মানুষ। তবে তাঁর ধর্মচর্চা শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সততা, বিনয়, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও দৈনন্দিন আচরণের মধ্যেই ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকাশ ঘটত।

সমাজে ইসলামী সংস্কৃতি ও সহিহভাবে ইসলামী শিক্ষা চর্চায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর কাছে ধর্ম ছিল মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির উপকরণ নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের পথ। বিজ্ঞান ও ধর্মকে তিনি বিপরীত দুই প্রান্ত হিসেবে দেখেননি। তাঁর জীবন যেন আমাদের শেখায়—বিজ্ঞান মানুষকে সৃষ্টিজগতের নিয়ম বুঝতে সাহায্য করে, আর ধর্ম সেই জ্ঞানকে ন্যায় ও মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করার নৈতিক শক্তি দেয়।

বিদ্যালয়ে তিনি ছিলেন হাজারো শিক্ষার্থীর অভিভাবক; ঘরে ছিলেন একজন স্নেহশীল স্বামী ও দায়িত্ববান পিতা। তাঁর সহধর্মিণী মোছাঃ রাবেয়া বেগম জীবনের দীর্ঘ পথের সঙ্গী ছিলেন। তাঁদের পাঁচ সন্তান—মোঃ আব্দুর রাকিব (রাজু), মোছাঃ জান্নাতুল ফেরদৌসি, মোছাঃ জান্নাত উল বাকী, মোছাঃ জান্নাত উল আরা এবং মোঃ আব্দুল মোক্তাদির (রকি)।
দিনভর বিদ্যালয়ে অন্যের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে ঘরে ফিরে তিনি নিজের পরিবারের জন্য হয়ে উঠতেন নির্ভরতার ছায়া। সন্তানদের কাছে তিনি শুধু পিতা ছিলেন না; ছিলেন আদর্শ, নৈতিক শিক্ষক এবং জীবনের পথনির্দেশক। একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য শুধু তাঁর পেশাগত অর্জনে নয়; তাঁর পরিবার, শিক্ষার্থী ও সমাজ তাঁকে কতখানি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করে—তার মধ্যেও প্রকাশ পায়। সেই বিচারে জালাল স্যার ছিলেন সত্যিই একজন সফল মানুষ।

২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ ও কর্মময় জীবনের অবসান ঘটিয়ে আলহাজ মোঃ জালাল উদ্দিন স্যার পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে শোক নেমে আসে পরিবারে, প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে, বিদ্যালয়ে এবং গোটা এলাকায়। একটি মানুষ চলে গেলেন—কিন্তু তাঁর সঙ্গে কি সত্যিই সবকিছু চলে গেল? বিদ্যালয়ের কোনো প্রাক্তন শিক্ষার্থী হয়তো সেদিন স্মৃতির ভেতরে আবার সেই পুরোনো শ্রেণিকক্ষে ফিরে গিয়েছিলেন। চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল কালো বোর্ড, সাদা চক আর জালাল স্যারের পরিচিত মুখ। কারও মনে পড়েছিল একটি কঠিন অঙ্ক বুঝিয়ে দেওয়ার কথা, কারও মনে পড়েছিল তাঁর শাসনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা স্নেহ, আবার কারও মনে পড়েছিল জীবনের সংকটে দেওয়া কোনো মূল্যবান পরামর্শ।

মৃত্যু মানুষের শরীরকে নিয়ে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম ও আদর্শকে নিতে পারে না। আজ তাঁর কোনো শিক্ষার্থী যখন একটি কঠিন সমস্যার সামনে ধৈর্য ধরে সমাধান খোঁজেন, তখন সেখানে জালাল স্যারের শেখানো যুক্তিবোধ বেঁচে থাকে। যখন কেউ সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, তখন তাঁর নৈতিক শিক্ষা প্রতিফলিত হয়। যখন কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, দেশকে ভালোবাসেন কিংবা অসহায় মানুষের পাশে হাত বাড়ান—তখন সেই কাজের মধ্যেও প্রিয় শিক্ষকের আলো জ্বলে ওঠে।
সময় বদলেছে। কালো বোর্ডের পাশে এসেছে আধুনিক প্রযুক্তি। পাঠদানের পদ্ধতি বদলেছে, বিদ্যালয়ের পরিবেশ বদলেছে, শিক্ষার্থীদের নতুন নতুন প্রজন্ম এসেছে। কিন্তু কিছু নাম সময়ের পরিবর্তনে পুরোনো হয় না।

জালাল স্যার তেমনই একটি নাম।
কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাস লিখতে গেলে তাঁর নাম এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ তিনি শুধু এই বিদ্যালয়ে চাকরি করেননি; নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়, মেধা ও শ্রম দিয়ে বিদ্যালয়টিকে সমৃদ্ধ করেছেন। তিনি ছিলেন জ্ঞানের সাধক, মানুষ গড়ার কারিগর, মুক্তিযুদ্ধের নীরব কৌশলী, ন্যায়নিষ্ঠ সামাজিক অভিভাবক এবং ধর্মীয় মূল্যবোধে আলোকিত একজন মানবিক মানুষ। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন আদর্শ শিক্ষক কখনো কেবল একটি বিষয়ের শিক্ষক নন। তিনি শিক্ষার্থীর বিবেক জাগান, চিন্তার দুয়ার খুলে দেন, চরিত্র নির্মাণ করেন এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে জাতিকে পথ দেখান।

বিদ্যালয়ের ঘণ্টাটি আজও বাজে। নতুন শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করে। নতুন শিক্ষক বোর্ডে অঙ্ক লেখেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এগিয়ে যায় সময়ের পথে। তবু এই প্রাঙ্গণের স্মৃতিতে কোথাও যেন একজন শিক্ষক আজও দাঁড়িয়ে আছেন—হাতে চক, চোখে দৃঢ়তা, হৃদয়ে অফুরন্ত স্নেহ।

তিনি যেন বলছেন—
“জ্ঞান অর্জন করো, যুক্তি দিয়ে ভাবো, সত্যের পথে থেকো এবং দেশ ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করো।”
প্রিয় জালাল স্যার, আপনি আজ আমাদের চোখের সামনে নেই। কিন্তু আপনার দেওয়া জ্ঞান, শাসনের আড়ালে থাকা মমতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা আমাদের পথ দেখিয়ে চলেছে।

আপনি ছিলেন আমাদের শিক্ষক।
আপনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক।
আপনি ছিলেন আমাদের আস্থার ঠিকানা।
আপনি বেঁচে আছেন কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের ইতিহাসে, অসংখ্য শিক্ষার্থীর সাফল্যে এবং হাজারো মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায়। আপনার জ্ঞানের প্রদীপ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে আলো ছড়িয়ে যাবে।

মানুষ চলে যান, কিন্তু আলোকিত মানুষের আলো কখনো নিভে যায় না।
মহান আল্লাহ তাআলা এই গুণী শিক্ষক, দেশপ্রেমিক ও সমাজহিতৈষী মানুষটির সকল ভালো কাজ কবুল করুন, তাঁর ভুলত্রুটি ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন।
প্রিয় জালাল স্যার, আপনার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা ও অন্তহীন কৃতজ্ঞতা।